রাইজ়িং স্টার এশিয়া কাপের প্রথম সেমিফাইনাল ভারত ও বাংলাদেশের তরুণ তারকাদের এক অসাধারণ লড়াই উপহার দিলেও শেষ পর্যন্ত ভারতকে ম্যাচ ছাড়তে হলো নিজেদের ভুলে। নিয়মিত ৪০ ওভারের খেলা শেষে দুই দলই সমান ১৯৪ রান করে। ফলে ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে—আর সেখানেই ঘটে বড় নাটক। ভারত সুপার ওভারে কোনও রানই তুলতে পারেনি, বিপরীতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বলেই প্রয়োজনীয় রান তুলে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে।
ম্যাচের সবচেয়ে বড় বিতর্ক উঠে আসে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত নিয়ে—সুপার ওভারে নামানো হয়নি বৈভব সূর্যবংশীকে। যিনি আগের ম্যাচসহ পুরো প্রতিযোগিতা জুড়ে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। ওপেনার হিসেবে ধারাবাহিক রান করলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাকে বসিয়ে রাখায় উঠছে প্রশ্ন।
বাংলাদেশের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের পর নাটকীয় শেষ দুই ওভার
ম্যাচের শুরুতে টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাট করতে পাঠান ভারতের অধিনায়ক জিতেশ শর্মা। প্রথম পাঁচ-ছয় ওভারেই বোঝা যায় বাংলাদেশ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক কৌশলে নামছে। ওপেনার জিশান ও হাবিবুর ভারতের বোলারদের ওপর চড়াও হন। প্রতি ওভারে ১০-এর বেশি রান তুলতে থাকে তারা।
পঞ্চম ওভারে গুরজপনীত সিংহ ভারতের প্রথম সাফল্য এনে দেন জিশান আলমকে ফিরিয়ে। মধ্য ওভারগুলোতে ভারতের স্পিনাররা ম্যাচটি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। রমনদীপ ১০তম ওভারে আবরারকে আউট করায় বাংলাদেশ চাপের মধ্যে পড়ে।
অন্যদিকে একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন ওপেনার হাবিবুর রহমান। তিনটি চার ও পাঁচটি ছয়ের সাহায্যে ৪৬ বলে ৬৫ রানের দারুণ ইনিংস খেলে তিনি দলকে এগিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু বাংলাদেশের বড় স্কোরের নেপথ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এসএম মেহেরোবের।
যেখানে ১৮ ওভারে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১৪৪/৬, শেষ দুই ওভারে দলটি যোগ করে অবিশ্বাস্য ৫০ রান। ১৯তম ওভারে নমন ধীরের এক ওভারে ২৮ রান আসে—একটি চার ও চারটি ছয়ে। শেষ ওভারে বিশাখকে দু’টি ছয় ও দু’টি চার মেরে মেহেরোব ইনিংস শেষ করেন ১৮ বলে ৪৮ রানে। ফলে বাংলাদেশ দাঁড়ায় ১৯৪ রানে।
ভারতের দারুণ শুরু, তারপর পরপর ধাক্কা
১৯৫ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে ভারত শুরু থেকেই আগ্রাসী ছিল। বৈভব সূর্যবংশী প্রতিপক্ষ বোলারদের ওপর ঝড় বইয়ে দেন। রিপনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বলে দুটি ছয়, পঞ্চম বলে চার—তারপর মেহেরোবকেও দুই ছক্কায় শাস্তি দেন। চলতি টুর্নামেন্টে ভারতের দ্রুততম দলগত ৫০ আসে মাত্র ৩.১ ওভারে।
প্রিয়াংশ আর্যও কিছুটা সময় নিয়ে হাত খোলার পর তৃতীয় ওভারে দুটি ছয় মারেন। কিন্তু বৈভব বড় শট খেলতে গিয়ে চতুর্থ ওভারে আউট হন—তার ৩৮ রানের ইনিংস ভারতকে জয়ের রাস্তায় এগিয়ে দিলেও ঝুঁকি বাড়ে তার বিদায়ে।
প্রিয়াংশ জমে ওঠা ইনিংস (৪৪) খেললেও নমন ধীরের ধীরগতির ব্যাটিং ভারতের রানচাপ বাড়ায়। ১২ বলে মাত্র সাত রান করেন তিনি। পরপর উইকেট পড়তে থাকায় ভারতের গতি থেমে যায়।
জিতেশ শর্মা ২৩ বলে ৩৩ রান করলেও তাকে ধরে রাখতে পারেনি ভারত। শেষ দিকে নেহাল ওয়াধেরাও কিছুটা বেশি বল খেলে ভারতকে চাপে ফেলে দেন। তবুও জয়ের আশা জিইয়ে রাখেন আশুতোষ শর্মা।
শেষ ওভারের রোমাঞ্চ আর জিশানের অবিশ্বাস্য ক্যাচ মিস
শেষ দুই ওভারে ভারতের দরকার ছিল ২১ রান। রিপন মণ্ডল দুর্দান্ত বোলিং করে মাত্র পাঁচ রান দিয়ে এক উইকেট তুলে নিলে ম্যাচের ভারসাম্য বাংলাদেশের দিকে ঘুরে যায়।
শেষ ওভারে প্রয়োজন ছিল ১৬ রান। আশুতোষ তৃতীয় বলে রাকিবুল হাসানকে বিশাল ছয় মারেন। পরের বলে তিনি সোজা একটি ক্যাচ তুলেছিলেন লং অফে। বলটি জিশানের সরল ক্যাচ হওয়ার কথা ছিল—কিন্তু অদ্ভুত ভুলে তিনি ক্যাচ ফস্কান। বল সোজা বাউন্ডারি লাইনে গিয়ে চার হয়ে যায়। এই চার ভারতকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে, কিন্তু পরবর্তী বলগুলোতে প্রয়োজনীয় রান উঠতে না পারে ম্যাচ টাই হয়।
সুপার ওভারের ব্যর্থতা এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
সুপার ওভারে ভারত একেবারেই চাপে পড়ে। ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল ব্যাটসম্যান নির্বাচন এবং যথাযথ প্ল্যানিং শূন্য—সব মিলিয়ে এক রানও তুলতে পারে না তারা। অন্যদিকে বাংলাদেশ সহজেই দুই বলে প্রয়োজনীয় রান তুলে ফাইনালে চলে যায়। প্রশ্নটা সেখানেই—ফর্মে থাকা বৈভবকে কেন সুপার ওভারে নামানো হলো না? সমর্থকরা ও ক্রিকেটবিশ্লেষকদের মতে, ভারতের পরাজয়ের মূল কারণ এই স্ট্র্যাটেজিক ভুল।
