মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে শুক্রবার (১৭ মে) এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল গোটা ক্রিকেটবিশ্ব। উদ্বোধন হল ‘রোহিত শর্মা স্ট্যান্ড’(Rohit Sharma Stand)-এর। এই স্ট্যান্ড কোনও সাধারণ স্ট্যান্ড নয়—এটি আবেগ, লড়াই, ভালবাসা এবং একটি ক্রিকেটার ও তাঁর সঙ্গিনীর ১৭ বছরের জীবনের প্রতিচ্ছবি। আর এই বিশেষ দিনে যখন স্ট্যান্ডটি রোহিতের নামে উন্মোচিত হল, সেই সময় চোখের কোণে আনন্দাশ্রু নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রীতিকা সাজদে—রোহিত শর্মার জীবনসঙ্গিনী।
ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ‘রোহিত শর্মা স্ট্যান্ড’(Rohit Sharma Stand)-এর উদ্বোধন শুধু এক ক্রিকেটারের কৃতিত্ব নয়, বরং ১৭ বছরের এক প্রেমকাহিনির পূর্ণতা। বোরিভেলি মাঠে প্রেম নিবেদন করে যাত্রা শুরু করেছিলেন রোহিত ও রীতিকা। আজ সেই প্রেম পেরিয়েছে শত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, উত্থান-পতন। রোহিত হয়েছেন ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার, আর রীতিকা থেকেছেন ছায়ার মতো পাশে। এই প্রেম, আবেগ এবং সফলতা মিলে তৈরি হয়েছে এক অনন্য সমাপতন, যা ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে ছুঁয়ে গেছে গভীরভাবে।
অবশ্যই দেখবেন: বাংলাদেশ সফরে অভিষেক করবেন প্রিয়াংশ, ১৫ সদস্যের দলে জায়গা পেলেন সুদর্শন-পাটিদার !!
প্রেম, প্রস্তাব আর ক্রিকেট: বোরিভেলি থেকে শুরু
২০০৮ সালের কথা। রোহিত শর্মা (Rohit Sharma) তখন কেবলমাত্র ভারতীয় দলে পা রেখেছেন। বয়স মাত্র ২০/২১। তখনও ক্রিকেট কেরিয়ার গুছিয়ে ওঠেনি, সামান্য কয়েকটি ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলেছেন মাত্র। কিন্তু জীবন তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল এক মহাকাব্যের মতো যাত্রার। আর সেই যাত্রার সঙ্গিনী হয়ে উঠবেন এক তরুণী—রীতিকা সাজদে।
তাঁদের প্রথম পরিচয় হয় পেশাগত কারণে। রীতিকা তখন মুম্বইয়ের এক স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট সংস্থার উচ্চপদে কর্মরত। সংস্থার কর্ণধার ছিলেন বান্টি সাজদে—যিনি যুবরাজ সিংহের বিজ্ঞাপন বিষয়ক ব্যবস্থাপনা করতেন। রীতিকা ছিলেন যুবরাজের ‘রাখি সিস্টার’। রোহিতকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব পান রীতিকা। কিন্তু পেশাগত সম্পর্ক ধীরে ধীরে রূপ নেয় বন্ধুত্বে, এবং সেখান থেকেই প্রেমে।
একদিন রোহিত রীতিকাকে নিয়ে যান বোরিভেলি স্পোর্টস ক্লাবে। যেখানে তাঁর ক্রিকেটজীবনের শুরু। মাঠের মাঝখানে পিচের উপর হাঁটু গেড়ে রোহিত বলেন,
“এটাই আমার প্রতিদিনের অফিস। আমার আঁতুড়ঘর। এখানেই আমি বেড়ে উঠেছি। তুমি কি আমার সঙ্গে হাঁটবে?” এই প্রস্তাবের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দু’জনের পথচলা শুরু হয়ে যায় ঠিক সেখান থেকেই।
অবশ্যই দেখবেন: বিরাট রোহিতের পর অবসর নিতে চলেছেন জাদেজা, তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন মাত্র ১৪টি ম্যাচ খেলা এই ম্যাচউইনার !!
রোহিত-রীতিকা: প্রেম থেকে বিবাহ ও পরিবার
২০০৮ সাল থেকে একসঙ্গে পথ চলা শুরু করেন তাঁরা। দীর্ঘ ছ’বছরের সম্পর্কের পর ২০১৫ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রোহিত ও রীতিকা। এই জুটির জীবনে আসে একের পর এক সুখবর—২০১৮ সালে জন্ম হয় তাঁদের প্রথম কন্যা সামাইরার। এরপর ২০২৪ সালে দ্বিতীয় সন্তান আহান আসে তাঁদের জীবনে।
রোহিত শুধু ক্রিকেট মাঠেই নন, পারিবারিক জীবনেও সমান যত্নশীল। কন্যাকে স্কুলে ছেড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে প্যারেন্ট-টিচার মিটিংয়ে উপস্থিত থাকা—সব ক্ষেত্রেই একজন নিখুঁত পারিবারিক মানুষ রোহিত। এই ভারসাম্যই তাঁকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে তুলে ধরে।

ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ‘রোহিত শর্মা স্ট্যান্ড’:(Rohit Sharma Stand) সম্মানের চূড়ান্ত মুহূর্ত
ক্রিকেট কেরিয়ারে বহু সাফল্যের সাক্ষী থেকেছেন রোহিত শর্মা—
- টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য
- ৩টি দ্বিশতরান ওয়ানডে ক্রিকেটে (বিশ্ব রেকর্ড)
- ভারতের তিন ফর্ম্যাটের অধিনায়ক
- ২০২3 ওয়ানডে বিশ্বকাপে ফাইনাল পর্যন্ত দেশকে পৌঁছে দেওয়া
এই মুহূর্তে তিনি টেস্ট থেকে অবসর নিয়েছেন। তবে ওয়ানডে ক্রিকেটে ২০২৭ বিশ্বকাপ পর্যন্ত খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এমন একজন কিংবদন্তির সম্মানে তাঁর শহরের বৃহত্তম স্টেডিয়ামে উদ্বোধন হল ‘রোহিত শর্মা স্ট্যান্ড’। আর সেই মুহূর্তে পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর জীবনসঙ্গিনী রীতিকা। চোখে জল নিয়ে। সেটি কোনও কষ্টের জল নয়—এ আনন্দাশ্রু, এক দীর্ঘ পথচলার প্রতিফলন।
অবশ্যই দেখবেন: ইংল্যান্ড সফরের আগেই গম্ভীরকে ছাঁটাই করলো বোর্ড, নতুন কোচের দায়িত্ব নেবেন তাঁর এই প্রিয় বন্ধু !!
রোহিত-রীতিকার সম্পর্ক: এক নিঃশব্দ কিন্তু দৃঢ় বন্ধন
ক্রিকেটার রোহিতের জীবনে রীতিকার প্রভাব নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য। শুধু প্রেমিকা বা স্ত্রী নন, বরং এক সার্থক সঙ্গিনী যিনি রোহিতের জীবনের ওঠাপড়া, ব্যর্থতা ও সফলতার সমস্ত মুহূর্তে পাশে থেকেছেন। যুবরাজ সিংয়ের সতর্কবার্তা ভুলে গিয়েও দু’জনের মধ্যেকার সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়েছে।
রীতিকা সবসময় থেকেছেন পর্দার আড়ালে—কখনও মাঠের গ্যালারিতে রোহিতের প্রতিটি বল গুনেছেন, কখনও বা সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে রোহিতকে দিয়েছে মানসিক প্রশান্তি।
অবশ্যই দেখবেন: বিরাট-রোহিত নয় বরং এই খেলোয়াড়কে ইংল্যান্ড সফরে মিস করবেন গম্ভীর, দীর্ঘদিন ধরে খেলেননি টেস্ট ক্রিকেট !!
সমাপতন নয়, এটা এক সফল যাত্রার সমাপ্তি
১৭ বছর আগে এক তরুণ ক্রিকেটার বোরিভেলি মাঠে প্রেম নিবেদন করেছিলেন। ১৭ বছর পরে সেই মানুষটির নামে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে তৈরি হল বিশেষ স্ট্যান্ড। এই বৃত্তপূরণ নিছক সমাপতন নয়—এ এক সফল যাত্রার দৃশ্যমান প্রমাণ।
এই স্ট্যান্ড যেন কেবল রোহিতের জন্য নয়, বরং সমস্ত সেই ক্রীড়াবিদের জন্য অনুপ্রেরণা যারা স্বপ্ন দেখে, কঠোর পরিশ্রম করে, এবং ভালবাসাকে ধরে রাখে যেকোনো পরিস্থিতিতে। এবং সেই ভালবাসার প্রতীক হয়ে রীতিকা আজও রোহিতের পাশে—ঠিক যেমনটা ছিলেন প্রথম দিন থেকে।
রোহিত শর্মা ও রীতিকা সাজদের এই প্রেমগাথা কেবলমাত্র এক দম্পতির নয়—এটি হল এক লড়াকু ক্রিকেটার ও তাঁর মনের মানুষের ভালোবাসার অনন্য উদাহরণ। যাদের সম্পর্কের ভিত ছিল বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও একে-অপরকে গ্রহণ করার মানসিকতা। ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে রোহিত শর্মা স্ট্যান্ড-এর উদ্বোধন যেন সেই ভালবাসার মূর্ত প্রতীক। আর এই অনন্য মুহূর্ত আমাদের শিখিয়ে দেয়—ক্যারিয়ার আর ভালোবাসা, যদি সমানভাবে সময় দেওয়া যায়, তাহলে বৃত্ত সম্পূর্ণ হতেই বাধ্য।
